সাহস

নেতৃত্ব দানের বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ হল সাহস থাকা। ভয়ের মুখোমুখী হয়ে তা জয় করার মাধ্যমেই এটি অর্জিত হয়
এবং এর প্রতিদানও যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। 
সাহস হলো উঠে দাঁড়ানো এবং বলতে পারার সামর্থ্য, সাহস হলো বসে অন্যদের কথা শুনতে পারার সামর্থ্যও। -উনস্টন
চার্চিল
সমালোচকদের মুখোমুখী তাদের কথা শোনা।  নিজের ইগো এবং ওদ্ধত্যের চেয়ে যদি আপনার সাহস আর বিনয় বেশি থাকে
তাহলে আপনার দ্বারা এটি করা অসম্ভব হবে না।
কষ্ট হতে পারে জেনেও নিজের বিশ্বাস অনুযায়ী কাজ  আয়না যা দেখা যায় তার সামনাসামনি হওয়া। ওয়ালডেনে থোরিউ
বলেছেন, “মানুষের মধ্যে অনেকেই নীরব হতাশায় জীবন কাটায়।” তাই তো আমাদের অনেকেই অস্বীকৃতির মাঝে বাস
করি কারণ আমরা আসলে যেরকম সেভাবে নিজেদেরকে দেখতে আমরা ভয় পাই।
নিজের স্বাভাবিক পরিবেশ থেকে বেরিয়ে এসে ভয়কে মোকাবেলা করা।  সাহস আসে কোথা থেকে? কেউ সাহস নিয়ে
জন্মায় না। অভিজ্ঞতার আলোকেই সাহস তৈরি করে নিতে হয়। যখনই আপনি আপনার ভয়কে মোকাবেলা করবেন,
তখনই আপনার আত্ম-বিশ্বাস আর সাহস বাড়বে। ফলাফল যাই হোক না কেন, আপনার ভয়ের কারণে আপনি যা ভাবতেন
ব্যাপারটা সেরকম নাও হতে পারে। এই জন্যই “আবার নিজের পায়ে উঠে দাঁড়ানো”রূপকটি এতটা শক্তিশালী।
তাছাড়া, আপনি যতবার ভয়কে প্রশয় দেবেন, তা ততই বাড়বে। আগে হোক বা পরে, একসময় দেখবেন যে আপনার ভয়
জয় করার আর কোনো সুযোগই নেই আপনার হাতে। এবং এর ফলে আপনার সারা জীবনের আফসোস তৈরি হবে।
ভয় মোকাবেলা করা এবং আফসোসের সুযোগ না রাখা দুটোই প্রেরণা সৃষ্টির জন্য শক্তিশালী। এর কোনো যথার্থ কারণ
হয়ত নেই তবে এটি যে আপনার ক্যারিয়ার আর জীবনে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে তা নিশ্চিত।

আরেকটি কথা যা হলফ করে বলা যায় তা হলো: আমাদের সবার মধ্যেই ভয় জয় করে সাহস তৈরি করার সমান সম্ভাবনা
রয়েছে। এখন আপনি সেই সম্ভাবনাকে কীভাবে কাজে লাগাবেন তার আপনার উপরই নির্ভর করবে।
আমাদের সমাজে এমন কিছু মানুষ আছে যারা নিজ থেকেই সচেতন ও কর্তব্যনিষ্ঠ। কোনো কাজ সমাপ্ত করার জন্য এ সকল
মানুষেরা অনুপ্রেরণা বা তাগিদের অপোয় থাকে না বরং স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিজের আগ্রহেই এগিয়ে যায়। তারা দায়িত্ব নিতে
যেমন পিছপা হয় না তেমন কার্য সম্পাদনের ক্ষেত্রেও কোনো অলসতা প্রদর্শন করে না। সমাজের এসকল সচেতন
ব্যক্তিবর্গের বৈশিষ্ট্যসমূহের মধ্যে অন্যতম হলো:
১. দায়িত্ববান- সচেতন বা কর্তব্যনিষ্ঠ ব্যক্তি কোনো দায়িত্ব নিতে ভয় পান না, তেমনি দায়িত্ব পালনে কোনো গড়িমসির
আশ্রয় নেন না।
২. সময় সচেতন- কর্তব্যনিষ্ঠ ব্যক্তি সময়ের ব্যাপারে হবেন একশভাগ সচেতন। সময়কে তিনি কাজে লাগাবেন
যথাযথভাবে। তার নিজের কর্মস্থলের সময় যেমন তিনি মেনে চলবেন, তেমন অন্যদের কাছ থেকেও তা প্রত্যাশা করবেন।
৩. আবেগ নিয়ন্ত্রণকারী- তিনি নিজের আবেগের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রাখতে সক্ষম হবেন। তাদের জানা থাকবে ইতিবাচক
আবেগের সুফল এবং নেতিবাচক আবেগের কুফল।
৪. কোনো অজুহাত নয়- কর্মনিষ্ঠ ব্যক্তি সকল কাজের ক্ষেত্রে অজুহাতকে এড়িয়ে চলে। নিজের ভুলে কোনো কাজে ত্রুটি-
বিচ্যুতি হলে তার দায় নিতে দ্বিধা করেন না।
৫. সহযোগিতাপূর্ণ- তারা হবেন পারস্পরিক সহযোগিতাপূর্ণ। কাজের ক্ষেত্রে অন্যের কোনো সমস্যায় সহযোগিতার হাত
প্রসারিত করবেন।
৬. আত্মপ্রত্যয়ী- তিনি হবেন আত্মপ্রত্যয়ী। সবাইকে সাথে নিয়ে কঠিন কার্যের সমাধানে হবেন দৃঢ় মনোবলের অধিকারী।
৭. সময়ের কাজ সঠিক সময়ে ও সঠিকভাবে সম্পন্ন করা সচেতন ভালো মানুষের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
৮. একজন সমাজ সচেতন মানুষ সদা সর্বদা সত্য কথা বলবেন, মিথ্যাকে পরিত্যাগ করবেন। নিজ নিজ ধর্মের অনুশাসন
বা বিধি-বিধানগুলো পরিপূর্ণভাবে মেনে চলবেন।
৯. নিজের মাতা-পিতা, ভাই-বোন, স্ত্রী-পুত্র-কন্যা, আত্মীয়-স্বজন, পরিবার-পরিজন, সমাজ, দেশ, দেশের মাটি, মানুষকে
অন্তর দিয়ে ভালোবাসবেন।
১০. একজন সচেতন ব্যক্তি সর্বদা পরোপকারী হবেন। নিজের স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে অন্যকে উপকার করার মানসিকতা লালন
করবেন।
সুখী-সমৃদ্ধশালী অনাবিল শান্তির সমাজ বিনির্মাণে ভালো মানুষের দায়িত্ব ও কর্তব্য অপরিসীম। একজন ভালো মানুষই পারে
পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্রে শান্তি-শৃঙ্খলা, স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে। তার যথার্থ ভূমিকায় গোটা সমাজ পরিবর্তন হতে
বাধ্য। তিনি সুন্দর সমাজ গঠনে ভালো কাজের বা সৎ কাজের আদেশ এবং মন্দ কাজ করতে নিষেধ করবেন। তিনি
যাবতীয় ভালো কাজের আদেশ করা ও মন্দ কাজে বাধা প্রদান করে সমাজ থেকে সব ধরনের অন্যায় কাজ দূরীভূত করে

ভালো কার্যাবলি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে শান্তি, শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনতে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করবেন। মানব সমাজে
ভালো কাজের আদেশ ও খারাপ কাজের নিষেধ এর যথাযথ প্রয়োগ অত্যন্ত জরুরি। মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে
বলেন-“ তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল বা গোষ্ঠী থাকা উচিত, যারা মানুষকে কল্যাণের দিকে আহবান করবে, ভালো
কাজের আদেশ দিবে এবং অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখবে, তারাই সফলকাম”। (সূরা আলে ইমরান : ১০৪)
ভালো মানুষ হতে হলে আমাদের শরীর বা দেহের উপর বিবেকের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে হবে। আমাদের শরীরটা আসলে
মানুষ নয়। এটা অন্য সব পশুর মতোই একটা পশু। পশু ভালো-মন্দ বোঝে না। ঠিক তেমনি শরীরও ভালো-মন্দের মধ্যে
কোনো পার্থক্য নির্ণয় করতে জানে না। যে মানুষটি ভালো-মন্দ নির্ণয় করে সে কিন্তু শরীর বা দেহ নয়। আমরা এটাকে
বিবেক বলে থাকি। ভালো কাজ করলে বিবেকের কাছে ভালো লাগে, মন্দ কাজ করলে বিবেক দংশন করে। মানুষের বিবেক
রয়েছে, পশুর বিবেক নেই। যে মানুষ বিবেকের প্রয়োজনে দেহের দাবিকে অগ্রাহ্য করার সামর্থ্য রাখে সে প্রকৃত বা ভালো
মানুষ। আর কোনো বিচার বিবেচনা না করে দেহ যা চায় তা-ই যে দিতে বাধ্য হয় সে মানুষ নয়, পশু। ছোটবেলা থেকে
আমাদের মা-বাবা, শিক্ষকগণ কতো চেষ্টাই না করেছেন আমাদেরকে ভালো মানুষ বানাতে। মক্তব, স্কুল, কলেজ, মাদরাসা,
বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়েছে; এমনকি উচ্চশিক্ষা নিতে বিদেশ পর্যন্ত পাঠিয়েছে মানুষ হওয়ার সর্বোচ্চ শিক্ষা নিতে। আজ
আমাদের নিজেদের বিবেকের আদালতে প্রশ্ন, আমরা কি মানুষের মতো মানুষ হতে পেরেছি? মানুষ হওয়ার চেষ্টা আমরা
করেছি বটে। মানুষ হওয়ার প্রয়াসে আমরা বুঝেছি- ভালো মানুষ হওয়া খুবই কষ্টের। ভালো মানুষ হওয়া যদিও খুবই কষ্টের
অমানুষ হওয়া মানুষ হওয়ার চেয়ে অনেক বেশি কষ্টের ও লাঞ্ছনার।
আমরা ভালো মানুষ হতে চাই। কতো মানুষ কতো ভাবেই না চেষ্টা করবে আমাকে ভালো মানুষ বানাতে, কিন্তু কেউ
আমাকে মানুষের মতো মানুষ বানাতে পারবে না যতক্ষণ না আমার নিজের প্রয়াস থাকবে। আমরা মানুষ হয়ে যখন
জন্মগ্রহণ করেছি, পশু হয়ে বেঁচে থাকতে চাই না, আমরা ভালো মানুষ হয়ে বেঁচে থাকতে চাই।