ধৈর্য্য

আনুগত্য ও ধৈর্য অবলম্বনেই রয়েছে সফলতা নেতার নেতৃত্ব মেনে নেয়া তথা আনুগত্য করা সব সময় গুরুত্বপূর্ণ। আর
সফলতা লাভে এ আনুগত্য বা নেতৃত্ব মানতে হবে নির্দেশ অনুযায়ী। নীতিবান নেতার আনুগত্য মেনে আল্লাহর হুকুম
বাস্তবায়ন ও ধৈর্য অবলম্বনেই রয়েছে সফলতা। ইসলামের ইতিহাসে যার নজীর রয়েছে অনেক।
ধৈর্য ও আনুগত্যের গুরুত্ব বুঝাতে আল্লাহ তাআলা হজরত শিমবিল কর্তৃক বনি ইসরাইলের জন্য নিযুক্ত নীতিবান বাদশাহ
তালুতের অনুসারীদের মাঝে তার নির্দেশ মেনে ধৈর্য ও আনুগত্যের বিষয়টি পবিত্র কুরআনুল কারিমে সুস্পষ্ট ভাষায়
উল্লেখ করা হয়েছে।

সুরা বাকারার ২৪৯ নং আয়াতে আল্লাহ তাআলা ধৈর্য ও আনুগত্যের গুরুত্ব তুলে ধরেছেন। আল্লাহ তাআলা তালুতের
সৈন্যবাহিনীর কাছ থেকে ধৈর্য ও আনুগত্যের যে প্রমাণ গ্রহণ করেছেন তা এ আয়াতে উঠে এসেছে। আরো উল্লেখ করা
হয়েছে যারা ধৈর্যের সাথে নেতার আনুগত্য মেনে নেয়; তাদের সংখ্যা কম হলেও তারা বড় দলকেও পরাজিত করতে
পারে। এটা মহান আল্লাহর একান্ত অনুগ্রহ। আর আল্লাহর অনুগ্রহ ধৈর্যশীলদের জন্যই নির্ধারিত।
আলোচ্য আয়াতের ব্যাখ্যায় জানা যায়, ‘যখন বনি ইসরাইলরা তালুতকে বাদশাহ হিসেবে মেনে নেয় তখন বাদশাহ তালুত
তাদের নিয়ে জেহাদের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে। তাফসিরকার সাদী বলেন, ‘তাদের সংখ্যা ছিল ৮০ হাজার।

তালুত তাদেরকে বললেন, ‘আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে পরীক্ষা করবেন একটি নদীর পানি দ্বারা; যারা এ নহরের পানি
পান করবে তারা আমার সঙ্গে জেহাদে যেতে পারবে না; অথবা পান করলেও মাত্র এক অঞ্জলি পান করবে; তারা আমার সঙ্গে
জেহাদে যেতে পারবে।
কিন্তু বনি ইসরাইলের প্রায় ৭৬ হাজার লোক তালুতের নির্দেশ অমান্য করে পানি পান করে। আর যারা সুদৃঢ় ঈমানের
অধিকারী ছিল তারা পানি পান থেকে বিরত থাকে। ফলে মাত্র ৪ হাজার লোক তালুতের নির্দেশ মেনে অর্থাৎ আল্লাহর হুকুম
মেনে পানি পান না করে সবর বা ধৈর্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলো।
যারা বাদশাহ তালুতের নির্দেশ না মেনে আল্লাহর হুকুমের অমান্য করে, তাদের মধ্যে সঙ্গে সঙ্গে পানি পানের প্রতিক্রিয়া
প্রকাশ পায়; তারা হীনবল হয়ে অত্যাচারী শাসক জালুতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে অস্বীকৃতি জানায়।
আর যারা ঈমানদার ছিলেন এবং নীতিবান শাসক তালুতের নির্দেশ মোতাবেক আল্লাহর হুকুম পালন করে তারা সাহসহীন
বনি ইসরাইলদের বুঝানোর চেষ্টা করে যে, ‘জয় পরাজয় আল্লাহ তাআলার হাতে’; সবর অবলম্বন করলে এবং নিয়ত সঠিক
হলে আল্লাহ তাআলা সাহায্য করবেন।
ইতিহাস সাক্ষী! পৃথিবীতে অনেক ছোট ছোট দল, অনেক বড় ও বিশাল সৈন্যবাহিনীর দলকে পরাজিত করে বিজয় লাভ
করেছে। আর তা আল্লাহ তাআলার সাহায্য পেয়ে বিজয় লাভ করেছে।
আল্লাহর প্রতি সুদৃঢ় ঈমান বা বিশ্বাস রেখে দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ হয়ে নেতার আনুগত্য করে আল্লাহর হুকুম পালন করলে বিজয়
অনিবার্য। আর আল্লাহর সাহায্যের ওপর আস্থা রাখা এবং সবর বা ধৈর্য অবলম্বনে রয়েছে কল্যাণ।
আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে নেতার আনুগত্য মেনে ধৈর্যের সঙ্গে আল্লাহর হুকুম যথাযথ বাস্তবায়ন করার মাধ্যমে
বিজয় লাভের তাওফিক দান করুন। আমিন। একদিন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহিকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল যে, ঈমান
কী? তিনি বললেন, ঈমান হচ্ছে ধৈর্য এবং সহনশীলতা। (সিলসিলা সহিহা)
এ কারণেই সহনশীলতা ইসলামের একটি মৌলিক নীতি এবং আবশ্যক পালনীয় ধর্মীয় নৈতিক কর্তব্য। সহনশীলতা ও ধৈর্য
অবলম্বনের অর্থ এই নয় যে, ‘ইসলাম কোনো অন্যায়ের ব্যাপারে কারো সঙ্গে আপস করে, ছাড় দেয়, অনুকম্পা বা প্রশ্রয়
দেয়।
আর এ কথাও বুঝায় না যে, ইসলামে নীতির অভাব রয়েছে। ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় ন্যায়ের পক্ষে গুরুত্বের অভাব রয়েছে। এ
কথা মনে রাখতে হবে যে, ইসলামই একমাত্র ভারসাম্যপূর্ণ ইনসাফ প্রতিষ্ঠার মূর্ত প্রতীক। ইসলাম সব সময় সহনশীল কিন্তু
অন্যায়, অত্যাচার, নিপীড়ন, অন্যের অধিকার কেড়ে নেয়াসহ আল্লাহ তাআলার অধিকার লঙ্ঘনে ছাড় দেয়ার কোনো
সুযোগ নেই। দুনিয়াতে শান্তি প্রতিষ্ঠায় সহনশীলতা ও ধৈর্যের বিকল্প নেই। আর ইসলাম ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও
রাষ্ট্রীয়সহ সকল ক্ষেত্রে সহনশীলতা শিক্ষা দেয়।
যেমন-পরিবারের সদস্যদের মধ্যে স্বামী-স্ত্রী, বাবা-মা, সন্তান-সন্তুতি এবং ভাই-বোনের মধ্যে সহনশীলতা; বিভিন্ন
সম্প্রদায়ের মতামত ও চিন্তার ক্ষেত্রে সহনশীলতা; এমনকি ইসলাম ও অন্যান্য ধর্মের মানুষের আন্তধর্মীয় সম্পর্ক, সংলাপ ও
সহযোগিতার মাধ্যমে সহনশীলতার প্রয়োজন অত্যাধিক। তাই ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও দেশের রাজনৈতিক, আইনগত,
সংস্কৃতিক, মানবাধিকার এবং আইনের শাসনের ক্ষেত্রে সহনশীলতার পথ অবলম্বন করা প্রত্যেক মানুষের নৈতিক ও ঈমানি

দায়িত্ব। আল্লাহ তাআলা মুসলিম উম্মাহকে ন্যায়ের পথে থেকে ধৈর্য ও সহনশীল ভূমিকা পালন করার তাওফিক দান করুন।
কুরআনে বর্ণিত সহনশীলতা ও ধৈর্য ধারণ করার মহা পুরস্কার লাভের তাওফিক দান করুন। আমিন।